নিউজ ডেস্ক : ভারতে ক্রমবর্ধমান সাইবার অপরাধের বিরুদ্ধে বড় সাফল্য অর্জন করেছে কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরো (সিবিআই) এবং বিভিন্ন রাজ্যের পুলিশ। সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক চাঞ্চল্যকর প্রতারণা ও ব্যাংক জালিয়াতির ঘটনায় বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
সিবিআই সম্প্রতি তিনজন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে একটি বিশাল সাইবার প্রতারণা চক্রের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে। তদন্তে জানা গেছে, এই চক্রটি “পার্ট-টাইম জব” এবং “অনলাইন ইনভেস্টমেন্ট”–এর প্রলোভন দেখিয়ে দেশের হাজার হাজার সাধারণ নাগরিককে প্রতারিত করেছিল। নাগরিকদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা সংগ্রহ করে, তারা তা দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে — কর্ণাটক, তামিলনাড়ু ও কেরালা — ছড়িয়ে থাকা শেল কোম্পানির মাধ্যমে মানি লন্ডারিং করত। সিবিআইয়ের অভিযান এই প্রতারণা নেটওয়ার্কের এক বড় অংশ ভেঙে দিয়েছে।
অন্য এক ঘটনায়, একটি সরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তারা ₹৩৮.২ লক্ষ টাকার প্রতারণার শিকার হন। তদন্তে জানা গেছে, একদল হ্যাকার ব্যাংকের অফিসিয়াল ইমেল অ্যাকাউন্টের মতো দেখতে একটি “স্পুফড” ইমেল অ্যাড্রেস ব্যবহার করে ব্যাংকের কর্মীদের কাছ থেকে জরুরি প্রকল্পের নামে অর্থ স্থানান্তর করায়। পরে দেখা যায়, ইমেলটি সম্পূর্ণ ভুয়া এবং টাকাগুলি একটি বিদেশি অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করা হয়েছে।
এদিকে, কলকাতা পুলিশ শহরের মধ্যে আরও একটি সাইবার প্রতারণা চক্রের ছয় সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে। অভিযোগ, এই চক্রটি এক নাগরিককে প্রতারণার মাধ্যমে ব্যাংকের নাম করে একটি ভুয়া লিঙ্ক পাঠিয়ে একটি ক্ষতিকর অ্যাপ ডাউনলোড করায়। ওই অ্যাপের মাধ্যমে তারা ভুক্তভোগীর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে ₹১.৩১ লক্ষ টাকা চুরি করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের সাইবার নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখন অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২২ সালে যেখানে প্রায় ১০.২৯ লক্ষ সাইবার নিরাপত্তা সংক্রান্ত ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছিল, সেখানে ২০২৪ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২২.৬৮ লক্ষে — প্রায় দ্বিগুণেরও বেশি।
দেশজুড়ে বাড়তে থাকা এই সাইবার অপরাধের বিরুদ্ধে সরকার ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলি বেশ কিছু পদক্ষেপ নিচ্ছে। এর মধ্যে অন্যতম হল সাইবার ফ্রড রিপোর্টিং হেল্পলাইন নম্বর ১৯৩০, যেখানে সাধারণ মানুষ প্রতারণার ঘটনার পরই ফোন করে অভিযোগ জানাতে পারেন। দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হলে অনেক ক্ষেত্রেই টাকা ফেরত পাওয়া সম্ভব হচ্ছে বলে জানা গেছে।
সিবিআইয়ের ‘অপারেশন চক্র-ভি’ নামের উদ্যোগ ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নজর কেড়েছে। এই অভিযানের মাধ্যমে একাধিক বিদেশি অপারেটিভ ও ভারতীয় সহযোগী নেটওয়ার্ককে চিহ্নিত করা হয়েছে, যারা একযোগে ভারতীয় নাগরিকদের লক্ষ্য করে প্রতারণা চালাচ্ছিল।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, ইন্টারনেট ও মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করার সময় নাগরিকদের আরও সতর্ক হতে হবে। অপরিচিত লিঙ্কে ক্লিক না করা, সন্দেহজনক ইমেলে প্রতিক্রিয়া না দেওয়া, এবং ব্যক্তিগত ব্যাংক তথ্য কখনোই অনলাইনে শেয়ার না করা — এই মৌলিক পদক্ষেপগুলোই হতে পারে সাইবার অপরাধের বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধ।
সাইবার অপরাধের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা ইঙ্গিত দিচ্ছে, ডিজিটাল যুগে নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ আরও গভীর হচ্ছে। তবে, সিবিআই ও পুলিশের সাম্প্রতিক সাফল্য এই বার্তাই দিচ্ছে — অপরাধ যতই আধুনিক হোক না কেন, আইনের হাত তার থেকেও দ্রুত ও শক্তিশালী।


