উত্তরবঙ্গের বন্যায় প্রকৃতির প্রতিশোধ: অবৈধ নির্মাণ, কাঠচোর ও বনদপ্তরের ব্যর্থতা ফাঁস করে দিল ভয়াবহ পরিস্থিতি

Spread the love

উত্তরবঙ্গের ভয়াবহ বন্যা শুধু মানুষের প্রাণহানিই ঘটায়নি, উন্মোচিত করেছে এক গভীর ও দীর্ঘদিনের সংকট—প্রকৃতির ওপর লাগামছাড়া হস্তক্ষেপের পরিণতি। পাহাড় থেকে নেমে আসা প্রবল জলস্রোতে তিস্তা ,তোর্সা, জলঢাকা, নেওড় নদীর তীরভূমি ভেসে গেছে। ডুবে গেছে শতাধিক গ্রাম, ভেসে গেছে ঘরবাড়ি ও প্রাণ। তবে এই বিপর্যয়ের পাশাপাশি উঠে এসেছে বহু ভয়ঙ্কর তথ্য—নদীর পাড় দখল, অবৈধ রিসর্ট, কাঠচোরের রমরমা ও বনদপ্তরের অবহেলা।

বন্যার সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে নদীপাড় দখল করে গড়ে ওঠা রিসর্ট ও হোটেলগুলি। স্থানীয়রা জানাচ্ছেন, বহু জায়গায় নদীর ধারে অবৈধভাবে নির্মিত রিসর্ট জলস্রোতে ভেসে গেছে। এই বেআইনি নির্মাণ নদীর স্বাভাবিক গতিপথে বাধা তৈরি করায় জলের প্রবাহ আরও তীব্র হয়ে পড়েছে। প্রশাসনের নীরবতা ও রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় বছরের পর বছর ধরে এই অবৈধ কাজ চলেছে।

এদিকে জঙ্গলাঞ্চলের ওপরও প্রভাব পড়েছে ভয়ঙ্করভাবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বন্যপ্রাণীরা যে নির্দিষ্ট পথে চলাচল করে, সেই পথগুলো এখন দখল হয়ে গেছে মানুষের বসতি, রিসর্ট ও ইলেকট্রিকের তারে। ফলে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের আগাম ইঙ্গিত পেলেও তারা নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছতে পারেনি। এই কারণেই এবারের বন্যায় গন্ডার, হাতি, হরিণ থেকে শুরু করে বহু দুর্লভ প্রাণী নদীর জলে ভেসে গেছে।নদী গুলির পাড়ে পাওয়া গেছে একাধিক মৃত বন্যপ্রাণীর দেহ।

বন্যা আরও একটি লুকিয়ে থাকা অপরাধকেও প্রকাশ্যে এনেছে—কাঠ চোরাচালান। তোর্সা ও জলঢাকা নদীতে লক্ষাধিক কাঠের লগ ভেসে যেতে দেখা গেছে। বনদপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে, এত বিপুল পরিমাণ কাঠ কোনও কাঠচেরাই মিলের নয়, বরং আগে থেকেই জঙ্গল থেকে কেটে মজুত রাখা হয়েছিল। অর্থাৎ, পাহাড়ি বনাঞ্চলে এখনও সক্রিয় রয়েছে শক্তিশালী কাঠচোর চক্র।

যদিও বনদপ্তর ও প্রশাসনের কেউ প্রকাশ্যে মুখ খুলতে চাননি, তবে অভ্যন্তরীণ সূত্রের দাবি—এই বিপুল কাঠচুরির ঘটনাই প্রমাণ করছে যে নজরদারি ব্যবস্থা কার্যত অচল। পাহাড় ও জঙ্গলে অবৈধ গাছকাটার ফলে বন্যার জল প্রবাহ বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে, যা ধ্বংস ডেকে আনছে গোটা অঞ্চলে।

বর্তমানে এনডিআরএফ, এসডিআরএফ, পুলিশ ও প্রশাসনের সমস্ত দপ্তর একযোগে উদ্ধারকাজ চালাচ্ছে। শত শত মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে আনা হয়েছে। জলপাইগুড়ি ও ডুয়ার্সের বিভিন্ন এলাকায় নদীপাড়ে ভেসে আসা কাঠ কুড়িয়ে নিচ্ছেন স্থানীয়রা, যা তাদের কাছে জীবিকার সাময়িক ভরসা। কিন্তু বনদপ্তরের নিষ্ক্রিয়তা ও দায়িত্বহীনতা নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন—এই বিপর্যয় কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং মানুষের লোভ ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার ফল। পাহাড়, জঙ্গল ও নদী যদি এখনই রক্ষা না করা হয়, উত্তরবঙ্গ ভবিষ্যতে আরও ভয়ঙ্কর বিপদের মুখে পড়বে। এবারের বন্যা যেন এক কঠোর বার্তা—প্রকৃতি বারবার সতর্ক করছে, কিন্তু মানুষ কি আদৌ শুনবে সেই সতর্কতা?

1


Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *