ঢাকার আদালতঘরে ইতিহাস যেন আবার নিজের কণ্ঠস্বর খুঁজে পেল। একসময় যাঁর নাম ছিল ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে, তিনিই আজ আদালতের নির্দেশে দুই ভিন্ন মামলায় সাজাপ্রাপ্ত। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে রায় ঘোষণা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তৈরি হয়েছে অভূতপূর্ব আলোড়ন, বার্তা স্পষ্ট—দেশের ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে গেছে।
প্রথম রায় আসে দুর্নীতির মামলায়। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের পূর্বাচল আবাসন প্রকল্পে অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার, স্বজনপ্রীতি এবং বিশেষ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগে ঢাকার আদালত শেখ হাসিনাকে ২১ বছরের কারাদণ্ড দেয়। একই মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন তাঁর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় এবং মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলও। জয়ের পাঁচ বছরের কারাদণ্ডের পাশাপাশি অর্থদণ্ড হয়েছে, আর পুতুলকে দেওয়া হয়েছে পাঁচ বছরের জেল। মামলায় আরও রয়েছেন সাবেক মন্ত্রী, সচিব এবং উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তারা—যারা একসময় ছিলেন তার প্রশাসনের অদৃশ্য যন্ত্রের মূলচাকা।
কিন্তু সবচেয়ে বড় আঘাত আসে আরেক রায়ে। বিশেষ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল জুলাই মাসে ছাত্র আন্দোলনের সময় গুলি চালানো, টর্চার সেন্টার পরিচালনা এবং নিখোঁজ-হত্যার অভিযোগে শেখ হাসিনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করে। আদালতের ভাষায়, এটি শুধুই রাজনৈতিক সহিংসতা নয়, বরং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ—যেখানে রাষ্ট্রের অস্ত্র ব্যবহৃত হয়েছে নাগরিকের প্রাণের বিরুদ্ধে। রায়ের অংশ হিসেবে তাঁর সম্পত্তি জব্দের নির্দেশ হয়েছে, যদিও তা নিহত পরিবারগুলিকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেওয়া হবে কি না—সেটি এখনো অনিশ্চিত।
রায়ের প্রতিক্রিয়ায় দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তপ্ত। আওয়ামী লীগ অভিযোগ করেছে, এটি প্রতিশোধমূলক মামলা, এবং বিচার হয়নি—বরং “দেখানো হয়েছে।” দলটি বলছে, আদালত পক্ষপাতদুষ্ট, প্রক্রিয়া অনিয়মে ভরা, এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়নি। অপরদিকে বিরোধী শিবির এবং আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা ছাত্র সংগঠনগুলো বলছে—এই রায় দেরিতে হলেও জনগণের প্রতি ন্যায়বিচারের প্রথম পদক্ষেপ।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চাপ জমতে শুরু করেছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলির ভাষ্য—রায় যতই গুরুতর হোক, তা হতে হবে স্বচ্ছ, পর্যবেক্ষণযোগ্য, এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত। বিশ্ব এখন দেখছে—বাংলাদেশ কোন পথে এগোয়—আইনের পথে, নাকি প্রতিশোধের।
জুলাইয়ের অস্থিরতার পর থেকে শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করেছেন। তাঁর অবস্থান আজও রহস্যে ঢাকা। একসময় জাতির “মা”, স্বাধীনতার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এবং উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের স্থপতি নামে যাঁকে প্রচার করা হয়েছিল—তিনি আজ রাষ্ট্রদণ্ড, আদালত এবং ইতিহাসের বিচারপাত্রে।
তাঁর উত্তরাধিকার এখন বিতর্কে বিভক্ত—অনেকে বলেন তিনি ছিলেন স্থিতিশীলতার ভিত্তি, আর অন্যরা মনে করেন তিনি ছিলেন ক্ষমতাকে রাষ্ট্র মনে করা এক ব্যক্তি।
ইতিহাস এখনো উল্টে দেখছে কোন সাইডে সেই ভার থামবে—বিচার, নাকি ব্যাখ্যার নামে ক্ষমতার আরেক নাটক। সময়ই লিখবে শেষ লাইন।


