জলপাইগুড়ি | India–Bangladesh Border News
দুপুর গড়িয়ে গেলেও জলপাইগুড়ির বেরুবাড়ির সিং পাড়ায় সূর্যের কোনও তাড়া নেই। দিগন্তছোঁয়া মাঠ জুড়ে ঘন কুয়াশা—আর সেই কুয়াশার মাঝেই দাঁড়িয়ে আছে ভারত–বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সীমান্ত। অবশ্য ‘আন্তর্জাতিক’ শব্দটি এখানে কাগজে-কলমেই মানায়। বাস্তবে সীমান্ত বলতে শুধু একটি জমির আল। পা ফেললেই দেশ বদলে যায়, কিন্তু চিন্তাভাবনার বদল হয় না।
বেরুবাড়ি এলাকায় প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার দীর্ঘ এই সীমান্তে নেই কোনও কাঁটাতার, নেই নদী বা প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধক। ফলে দিনের বেলায় ভারত ও বাংলাদেশের মানুষ অনায়াসে যাতায়াত করেন। চাষ করতে করতে একই আলের উপর বসে দুই দেশের নাগরিকেরা গল্প করেন। তখন সীমান্ত যেন ‘আন্তর্জাতিক সৌহার্দ্যের মডেল’। কিন্তু রাত নামলেই সেই মডেল বদলে যায়—বন্ধুত্বের বদলে আসে চোরাচালান, আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তা।
সিং পাড়া মসজিদের সামনে স্থানীয় বাসিন্দা মালা রায় বললেন, “বাংলাদেশে সামান্য গন্ডগোল হলেই আমাদের বুক ধড়ফড় শুরু হয়ে যায়। দিপু দাসের ঘটনার সময় আমরা খুব ভয়ে ছিলাম। বিএসএফ ৫০০ মিটার অন্তর থাকলেও কুয়াশা নামলে তাঁদেরও কিছু করার থাকে না।” তাঁর কথায় স্পষ্ট—কুয়াশা এখানে শুধু আবহাওয়া নয়, নিরাপত্তারও অজুহাত।
বছর সত্তরের সামসুদ্দিন জানালেন, সীমান্তে যাতায়াতে সমস্যা না থাকলেও ফসলের ক্ষতি নিত্যদিনের ঘটনা। “সকালে উঠে দেখি ক্ষেতের উপর দিয়ে গরু নিয়ে গেছে। রাতে গরু পাচার চলে, চোরাই চালান বন্ধ হয় না।” মুকুলেশ্বর মিয়ার বক্তব্য আরও তীর্যক, “গরু পাচারে বাংলাদেশের লোকজন আছে ঠিকই, তবে আমাদের দেশের কিছু মহাজনও যে সাধু—তা কেউ হলফ করে বলতে পারবে?”
টহলরত বিএসএফ জওয়ানদের কাছে সীমান্তে বেড়া কবে হবে জানতে চাইলে উত্তর মেলে কূটনৈতিক হাসিতে। মন্তব্য নেই, শুধু পরামর্শ—“জিরো পয়েন্ট মে মত আও।” কেন্দ্র সরকার জমি জটিলতার কথা বললেও বাস্তবে সীমান্ত লাগোয়া জমিতে গাছের ফল পাড়া বা ঝাড়ের বাঁশ কাটতেই বিএসএফের বাধা। আবার গরু পাচার ধরলেই সন্দেহের বশে লাঠির ঘা—দুই রাষ্ট্রের মাঝখানে পড়ে থাকছেন গ্রামের সাধারণ মানুষ।
আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারত–বাংলাদেশ বন্ধুত্ব, বাণিজ্য আর সহযোগিতার গল্প যতই শোনা যাক, বেরুবাড়ির সিং পাড়ায় দাঁড়ালে বোঝা যায়—এখানে আন্তর্জাতিক সীমান্ত মানে কাঁটাতার নয়, কুয়াশা। দিনে দুই দেশের নাগরিক, রাতে দুই রাষ্ট্রেরই অদৃশ্য প্রজা—এই তীর্যক বাস্তবতাই সিং পাড়ার নিত্যদিনের খবর।


