EXCLUSIVE: সুভাষগ্রামে নৃশংসতা: জামাইকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠানোর রাগে সাড়ে চার বছরের নাতনিকে খুন! মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বললেন ‘সাইকোপ্যাথিক রিপিট অফেন্ডার’

Spread the love

📍স্থান: সুভাষগ্রাম, দক্ষিণ ২৪ পরগনা
🗓️ তারিখ: ২০ অক্টোবর ২০২৫

দক্ষিণ ২৪ পরগনার সুভাষগ্রামের কোদালিয়া এলাকায় শনিবার বিকেলে ঘটল এক মর্মান্তিক ও নৃশংস ঘটনা। পারিবারিক রাগ-অভিমান ও মানসিক বিকারের বলি হল মাত্র সাড়ে চার বছরের একটি শিশু — প্রত্যুষা কর্মকার। অভিযোগ, শিশুটিকে নৃশংসভাবে পিটিয়ে খুন করেছে তারই দাদু, ৭১ বছর বয়সী প্রণব ভট্টাচার্য। ঘটনায় রীতিমতো তোলপাড় সুভাষগ্রাম ও আশেপাশের এলাকায়।

পুলিশ সূত্রে খবর, ১৯ অক্টোবর বিকেল তিনটে থেকে সাড়ে তিনটার মধ্যে এই ঘটনাটি ঘটে। প্রত্যুষার বাবা প্রশান্ত কর্মকার ও মা উমা ভট্টাচার্য কর্মকার দুজনেই বেসরকারি সংস্থায় চাকরি করেন। প্রতিদিনের মতো সেদিনও সকালে তাঁরা কাজে বেরিয়ে যান। বাড়িতে ছিলেন প্রশান্তর শ্বশুর-শাশুড়ি ও এক গৃহকর্মী। বিকেল সাড়ে তিনটে নাগাদ হঠাৎ প্রণব ভট্টাচার্যের স্ত্রী পাশের বাড়ির লোকজনকে ডাকতে শুরু করেন — জানান, ছোট্ট প্রত্যুষা পড়ে গিয়ে অচেতন হয়ে পড়েছে।

পাশের বাড়ির লোকজন ছুটে এসে দেখেন, শিশুটির কান ও চোখের কোণে রক্ত, শরীরে একাধিক ক্ষতের দাগ। সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যুষাকে সুভাষগ্রাম হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন এবং প্রাথমিক পরীক্ষাতেই জানান—মৃত্যুটি স্বাভাবিক নয়, এটি স্পষ্টতই খুনের ঘটনা।

খবর পেয়ে শিশুটির বাবা প্রশান্ত কর্মকার ছুটে আসেন এবং পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের করেন। পুলিশ দ্রুত তদন্ত শুরু করে এবং বাড়ি থেকে প্রণব ভট্টাচার্যকে আটক করে। দীর্ঘ জেরার পর প্রণব অপরাধের কথা স্বীকার করে নেয়।

পুলিশের হাতে প্রণব জানায়, জামাই প্রশান্ত একদিন রাগের মাথায় বলেছিল, “তোমাদের বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দেব।” সেই কথাটিই তার মনে গভীর ক্ষোভ তৈরি করে। সেই রাগেই সে প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিল — জামাই-জামাইবউ ও নাতনিকে হত্যা করার পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত একা পেয়ে নাতনির ওপরই সে তার বিকৃত রাগ উগরে দেয়।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রণব ভট্টাচার্য অত্যন্ত রাগী ও মানসিকভাবে অস্থির প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। এমনকি প্রতিবেশীদের অনেকেই দাবি করেছেন, ছোট মেয়েদের প্রতি তার আচরণ ছিল অস্বাভাবিক ও অমানবিক। তদন্তে আরও জানা গেছে, বহু বছর আগে প্রণব তার আর এক কন্যাকেও একইভাবে খুন করেছিল বলে গুঞ্জন রয়েছে।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. সব্যসাচী মিত্র এই ঘটনাটিকে “সাইকোপ্যাথিক রিপিট অফেন্ডার”–এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ বলে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে, “এই ধরনের অপরাধীরা একবার নয়, বারবার সহিংসতা প্রদর্শন করে। তারা দুর্বলদের, বিশেষত শিশু বা নারীদের লক্ষ্য করে, কারণ তারা প্রতিরোধ করতে পারে না। তাদের মধ্যে নারী বিদ্বেষ এবং সহিংস প্রবণতা গভীরভাবে প্রোথিত থাকে।”

তিনি আরও বলেন, “প্রণব ভট্টাচার্যের মতো ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ডিমেনশিয়া বা বয়সজনিত মানসিক বিকার থাকতে পারে। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে যাদের অন্তর্নিহিত রাগ ও ঘৃণা দমন করা যায় না, তাদের সামাজিক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যায়। ফলে রাগের বিস্ফোরণ ঘটে চরম সহিংসতায়।”

বর্তমানে অভিযুক্ত প্রণব ভট্টাচার্য অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি আছেন। পুলিশ জানিয়েছে, তাঁর মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নেওয়া হচ্ছে।

এদিকে এই নৃশংস ঘটনায় শোকের ছায়া নেমেছে কোদালিয়া ও আশপাশের গ্রামাঞ্চলে। প্রতিবেশীরা এখনো বিশ্বাস করতে পারছেন না যে এক দাদু নিজের নাতনির প্রাণ নিতে পারে। সমাজবিদদের মতে, এটি কেবল পারিবারিক বিরোধ নয়—এটি মানসিক অসুস্থতা ও সামাজিক অবক্ষয়ের এক জ্বলন্ত উদাহরণ।

এক প্রতিবেশী বলেন, “আমরা কখনো ভাবিনি প্রণববাবু এমন করতে পারেন। প্রত্যুষা ছিল খুব শান্ত, হাসিখুশি বাচ্চা। ওর মৃত্যু আমরা মেনে নিতে পারছি না।”

এই মর্মান্তিক ঘটনাটি আবারও সামনে আনল প্রশ্ন—বৃদ্ধ বয়সে মানসিক অবক্ষয় এবং সামাজিক অবহেলার ফাঁদে জড়িয়ে কেমন করে একজন মানুষ নৃশংস খুনিতে পরিণত হতে পারে?


Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *