আইপ্যাক মামলাকে ঘিরে গত শুক্রবার কলকাতা হাই কোর্টে যে নজিরবিহীন বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছিল, তার পর বুধবারের শুনানি ঘিরে ছিল প্রবল কৌতূহল। বিচারপতি শুভ্রা ঘোষের এজলাসে কঠোর নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই শুরু হয় এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট ও তৃণমূল কংগ্রেসের দায়ের করা মামলার শুনানি। আগেই নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল—এজলাসে কোনও অবাঞ্ছিত ব্যক্তির প্রবেশ নিষিদ্ধ এবং পুরো শুনানি হবে লাইভ স্ট্রিমিংয়ের মাধ্যমে।
শুনানির শুরুতেই ইডির তরফে জানানো হয়, আইপ্যাক সংক্রান্ত একই বিষয় নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে স্পেশাল লিভ পিটিশন দায়ের করা হয়েছে। সেই যুক্তিতে হাই কোর্টে মামলাটি খারিজ বা অন্তত মুলতুবি রাখার আবেদন জানায় কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা। যদিও তৃণমূলের আইনজীবীরা স্পষ্ট জানান, হাই কোর্টেই এই মামলার শুনানি চলতে পারে এবং ইডির দাবি বিভ্রান্তিকর।
ইডির সওয়ালে বলা হয়, পিএমএলএ আইনের ১৭ নম্বর ধারায় তল্লাশি চালানো হলেও লাউডন স্ট্রিটে প্রতীক জৈনের বাড়ি বা সল্টলেকে আইপ্যাকের দফতর থেকে কোনও নথি বাজেয়াপ্ত করা হয়নি। বরং ইডির অভিযোগ, ঘটনাস্থল থেকে গুরুত্বপূর্ণ নথি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিয়ে গিয়েছেন। সেই কারণেই মামলায় মুখ্যমন্ত্রীকে পক্ষভুক্ত না করলে তৃণমূলের আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় বলেও দাবি করে ইডি।
এই অভিযোগে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায় তৃণমূল কংগ্রেস। দলটির আইনজীবীরা বলেন, ইডির এই বক্তব্য যদি সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে তারা মামলা প্রত্যাহার করতেও প্রস্তুত। পাশাপাশি ইডির অভিযোগ আদালতের নথিতে রেকর্ড করার জোরালো দাবি তোলা হয়। শেষ পর্যন্ত দু’পক্ষের বক্তব্যই রেকর্ড করে আদালত।
শুনানিতে কেন্দ্রের অ্যাডিশনাল সলিশিটর জেনারেল এস ভি রাজু দাবি করেন, ইডির তল্লাশির সঙ্গে কোনওভাবেই আসন্ন ভোটের যোগ নেই। তৃণমূল ২০২৬ সালের নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের অভিযোগ তুললেও এখনও নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণা হয়নি বলে তিনি যুক্তি দেন। এমনকি আইপ্যাক এসআইআর সংক্রান্ত কাজ করলেও কোনও রাজনৈতিক দলের দফতরে অভিযান চালানো হয়নি বলেও জানান তিনি।
শুনানির মাঝেই ভারচুয়াল মাধ্যমে সওয়াল করার সময় এস ভি রাজুর মাইক বারবার বন্ধ হয়ে যাওয়াকে কেন্দ্র করে এজলাসে উত্তেজনা ছড়ায়। মুহূর্তে তৈরি হয় হইচই, যা আবারও আদালতের পরিবেশকে অস্থির করে তোলে।
দীর্ঘ শুনানি শেষে বিচারপতি শুভ্রা ঘোষ স্পষ্ট করেন, যেহেতু একই বিষয় নিয়ে মামলা বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন, তাই সেই প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত ইডির মামলায় হাই কোর্টে কোনও নির্দেশ দেওয়া সম্ভব নয়। ফলে ইডির মামলা আপাতত মুলতুবি রাখা হয়। অন্যদিকে, তৃণমূল কংগ্রেসের দায়ের করা মামলার নিষ্পত্তি করে দেয় আদালত।
এই নির্দেশে একদিকে যেমন তৃণমূল মামলায় ইতি টানল হাই কোর্ট, তেমনই আইপ্যাক কাণ্ডে কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাতের আইনি লড়াই যে আরও বড় মঞ্চে গড়াতে চলেছে, তা স্পষ্ট হয়ে গেল।


