হিন্দু ধর্মে দেবী কালী এক অত্যন্ত শক্তিশালী ও ভয়ঙ্কর রূপে পরিচিত। তিনি মহাশক্তির প্রতীক, ধ্বংস ও সৃষ্টির মধ্যবর্তী ভারসাম্যের প্রতিমূর্তি। দেবী কালী হলেন আদিশক্তি পার্বতীর এক উগ্র রূপ, যিনি অশুভ শক্তির বিনাশ ঘটিয়ে বিশ্বে শান্তি ও ধর্ম প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর রূপ অন্ধকার, হাতে খড়গ, খুলি-মালা, জিহ্বা রক্তলাল, শরীরে বাঘছাল—এই ভয়ঙ্কর রূপেই তিনি দুষ্টের বিনাশ ও সুকর্মের রক্ষার বার্তা দেন।
কালীর সৃষ্টি কাহিনি
পুরাণ অনুসারে, দেবী কালী প্রথম প্রকাশিত হন দেবী দুর্গার শরীর থেকে। যখন অসুররা দেবতাদের পরাজিত করে সমস্ত জগতে অরাজকতা সৃষ্টি করেছিল, তখন দেবী দুর্গার ভ্রূকুটি থেকে এক তেজস্বিনী, কৃষ্ণবর্ণা দেবী জন্ম নেন। তিনিই কালী। তিনি অসংখ্য অসুরকে বিনাশ করে দেবতাদের মুক্তি দেন। দেবী কালী মূলত “সময়” বা “কাল”-এর প্রতীক, তাই তাঁর নাম “কালী”—যিনি সময় ও মৃত্যুরও ঊর্ধ্বে।
বাংলায় কালীপূজার সূচনা
বাংলায় কালীপূজার প্রচলন বহু প্রাচীন হলেও, ঐতিহাসিকভাবে ধরা হয় যে, মধ্যযুগে তান্ত্রিক সাধনাপদ্ধতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে কালীপূজা জনপ্রিয় হয়। পঞ্চদশ-ষোড়শ শতকে কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ ও নবদ্বীপের অন্যান্য তান্ত্রিক সাধকগণ কালী আরাধনাকে বিশেষ গুরুত্ব দেন। পরে রাজা কৃষ্ণচন্দ্র ও রাজা নবকৃষ্ণ দেবের সময়ে, বিশেষ করে আঠারো শতকে, কালীপূজা এক সামাজিক উৎসবে রূপ নেয়। কলকাতায় শোভাবাজার রাজবাড়ির কালীপূজাই প্রথম বড় আকারে অনুষ্ঠিত হয়, যা পরবর্তীতে সমগ্র বাংলায় ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
কেন কালীপূজা হয়
দেবী কালী কেবল ধ্বংসের দেবী নন, তিনি মাতৃরূপে করুণা ও সুরক্ষার প্রতীকও বটে। মানুষ বিশ্বাস করে, তিনি অশুভ শক্তিকে বিনাশ করে ভক্তকে দুঃখ, ভয় ও বাধা থেকে রক্ষা করেন। কালীপূজার রাত্রি সাধারণত অমাবস্যার রাতে হয়—যখন চারিদিক অন্ধকারে আচ্ছন্ন থাকে, তখন সেই অন্ধকার দূর করে আলোর প্রতীক হিসেবে দেবী কালীকে আহ্বান করা হয়। এই পূজার মাধ্যমে মানুষ নিজের ভয়, লোভ, রাগ ইত্যাদি নীচ প্রবৃত্তিকে দমন করার প্রতিজ্ঞা করে।
উপসংহার
দেবী কালী হলেন শক্তি, সাহস ও ন্যায়ের প্রতীক। তাঁর পূজার মধ্যে নিহিত আছে আত্মজয়, অশুভের বিনাশ ও মানবতার রক্ষা। বাংলার কালীপূজা শুধু একটি ধর্মীয় আচার নয়, এটি বাঙালির সংস্কৃতি, ভক্তি ও সাহসের বহিঃপ্রকাশ। আজও অমাবস্যার রাত্রিতে দীপের আলোয়, ধূপের গন্ধে, ও মন্ত্রধ্বনিতে যখন কালীমূর্তি পূজিত হয়, তখন মনে হয়—অন্ধকারের পরেই আসে আলো, মৃত্যু-ধ্বংসের মধ্য দিয়েই জন্ম নেয় নতুন সৃষ্টি।


