কলকাতা, ২০২৫:
শঙ্কু সাঁতরা: শরতের আকাশে তখন ঢাকের আওয়াজ, প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে আলো আর ভিড়ের ঢেউ। শহরজুড়ে হাসি, আনন্দ, জমজমাট বাজার। কিন্তু এই আনন্দের শহরেই, আলো-ঝলমলের পুজোর মাঝখানে, এক কোণে পড়ে আছে এক অন্য কলকাতা — সোনাগাছি। দুর্গাপুজো মানেই যেখানে অতিরিক্ত আয়ের আশায় যৌনকর্মীদের চোখে ভেসে ওঠে একটু স্বস্তির ছোঁয়া, সেখানে এবারের পুজো যেন হয়ে উঠল দুঃস্বপ্ন।
“অষ্টমী, নবমীর রাতগুলোতে সাধারণত সোনাগাছির গলিতে পা রাখার জায়গা থাকে না,” বললেন দূর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটির সেক্রেটারি বিশাখা লস্কর। “কিন্তু এবার দেখলাম ছেলেরা গলির মধ্যে ক্রিকেট খেলছে! এমনটা কখনও দেখিনি।” তাঁর গলায় ক্লান্তি, হতাশা আর উদ্বেগের সুর।
সোনাগাছির অর্থনীতি পুজোর মরশুমে সাধারণত একটু প্রাণ পায়। শহরের নানা প্রান্ত থেকে খরিদ্দাররা আসেন, আর সেই ভিড়ই বছরে কয়েকদিনের জন্য যৌনকর্মীদের মুখে হাসি ফোটায়। কিন্তু এবারে যেন সব সমীকরণ উলটে গেল।
গলির মুখে মুখে দাঁড়িয়ে পড়েছিল কিছু স্থানীয় দুষ্কৃতী। তাদের দাবি — “পুজোর চাঁদা”। কেউ ৫০০ টাকা, কেউ ৫,০০০ টাকা, কখনও তারও বেশি। যে খরিদ্দার দেননি তাঁকে ধরে হেনস্থা, গালিগালাজ, এমনকি মারধরের ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ। ফলে আতঙ্কে গলি মুখী হতে চাননি অনেকে ।
“কাস্টমাররা বলছে, বাইরে যেতেই ভয় লাগছে। মার খেতে হবে যদি?” — বললেন এক যৌনকর্মী, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক। “আমাদের তো ওদের না দিলেও চলে না, দিলেও শান্তি নেই। এভাবে ক’দিন চলবে বলুন?”
ফলে এবছর যা হওয়ার তাই হয়েছে। আয় প্রায় অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে। সোনাগাছি এলাকায় কন্ডোম বিক্রির পরিমাণে ব্যাপক পতন সেই বাস্তবতাই প্রমাণ করছে। স্থানীয় ফার্মেসি ও দোকান গুলির কথায়, এবছর দুর্গাপুজোর সময় কন্ডম বিক্রি হয়েছে গত বছরের তুলনায় অন্তত ৪০ শতাংশ কম।
বিশাখা লস্কর জানালেন, “আমরা সব খবর পাই। কারা চাঁদা তুলছে, কারা মারধর করছে — সবই জানা। কিন্তু ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করতে চান না। কারণ তাঁরা জানেন, অভিযোগ করলেই আরও প্রতিশোধ নেবে।” এই নীরবতা, তাঁর কথায়, প্রশাসনিক উদ্যোগের সবচেয়ে বড় বাধা।
দূর্বারের তথ্য অনুযায়ী, বহু যৌনকর্মী এখন ঋণের জালে জড়িয়ে পড়েছেন। আয় কমে যাওয়ায় দৈনন্দিন খরচ মেটানোই কঠিন হয়ে পড়ছে। অনেকেই বাচ্চাদের স্কুলের ফি দিতে পারছেন না, কেউ কেউ বাড়ি ভাড়াও বকেয়া রেখে দিচ্ছেন।
একসময় এই সোনাগাছি ছিল যৌনকর্মীদের ‘নিরাপদ’ জীবিকার প্রতীক। দূর্বারের লড়াই, সচেতনতা প্রচার, স্বাস্থ্যসেবা— সবই মিলে এখানকার ওই পেশার নারীরা একটু হলেও মাথা তুলে বাঁচতে শিখেছিলেন। কিন্তু সাম্প্রতিক বছর গুলিতে বদলে গেছে সেই ছবি। এলাকা জুড়ে ক্রমবর্ধমান চাঁদাবাজি, স্থানীয় গুন্ডাদের দৌরাত্ম্য, পুলিশের নীরবতা— সব মিলিয়ে যেন আবার অন্ধকারে ঢেকে যাচ্ছে এই পল্লী।
বিশাখা বলেন, “আমরা শুধু টাকার ক্ষতি নিয়ে চিন্তা করছি না, ভাবছি নিরাপত্তা নিয়ে। যদি কেউ কাজেই না আসে, তাহলে আমাদের বেঁচে থাকাটাই প্রশ্নের মুখে পড়বে।”
পুজোর আলো যেখানে শহরজুড়ে সুখ আর উৎসবের বার্তা দিয়েছে, সেখানে সোনাগাছির আঁধারে লুকিয়ে আছে এক নীরব কান্না। যে গলিগুলো একসময় মানুষের ভিড়ে গমগম করত, সেখানকার দেয়ালে এখন ঝুলে আছে একটাই প্রশ্ন — এই শহরের আনন্দে আমাদেরও কি কোনও স্থান আছে?
সোনাগাছির আকাশে এবারে পুজোর ঢাক নয়, শোনা গেছে ভয় আর হতাশার প্রতিধ্বনি। আর যৌনকর্মীদের চোখে, সেই প্রতিধ্বনির মাঝেই মিশে গেছে একটাই প্রার্থনা — পরের পুজোয় যেন একটু আলো ফিরে আসে।


