দুর্গাপুরের বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজের ডাক্তারি পড়ুয়াকে ‘গণধর্ষণ’-এর অভিযোগে যে নৃশংস ঘটনা রাজ্যজুড়ে ক্ষোভ ও আলোড়ন সৃষ্টি করেছে, তা আবারও সমাজের নিরাপত্তা ও দায়িত্ববোধের প্রশ্নকে সামনে এনে দিয়েছে। এক তরুণী, যিনি চিকিৎসা পেশায় যোগ দেওয়ার স্বপ্নে দূর রাজ্য থেকে এসেছিলেন, তাঁকে এইভাবে অপমানিত হতে হয়েছে—এ দৃশ্য শুধু বাংলার নয়, গোটা দেশের বিবেককে নাড়া দিয়েছে।
ঘটনার প্রাথমিক সূত্র অনুযায়ী, শুক্রবার রাতে ওই ছাত্রী তাঁর এক সহপাঠীর সঙ্গে কলেজ ক্যাম্পাসের বাইরে বেরিয়েছিলেন। পুলিশ তদন্তে জানতে পেরেছে, ওই সহপাঠীই তাঁকে ভুল বুঝিয়ে দুর্গাপুর গভর্নমেন্ট কলেজের দিকের একটি নির্জন জায়গায় নিয়ে যান, যেখানে উপস্থিত ছিল কিছু নেশাগ্রস্ত যুবক। অভিযোগ, সেখানেই মেয়েটিকে টেনেহিঁচড়ে জঙ্গলে নিয়ে গিয়ে গণধর্ষণ করা হয়। পুলিশ ইতিমধ্যেই তিন অভিযুক্তকে গ্রেফতার করেছে, আর মূল সহপাঠীকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। ধৃতদের কাছ থেকে তরুণীর মোবাইলও উদ্ধার হয়েছে বলে জানা গেছে।
এই নৃশংস ঘটনার পর মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কঠোর পদক্ষেপের নির্দেশ দিয়েছেন এবং জানিয়েছেন, “কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।” তবে তাঁর বক্তব্যের একটি অংশ—যেখানে তিনি বলেন, “রাতে মেয়েদের বাইরে না বেরোনাই ভালো”—তা নিয়েই শুরু হয়েছে রাজনৈতিক বিতর্ক। বিরোধীরা অভিযোগ করেছেন, মুখ্যমন্ত্রী দায় এড়ানোর চেষ্টা করছেন এবং নারীদের ঘরবন্দি থাকতে পরামর্শ দিচ্ছেন, যা সভ্য সমাজে গ্রহণযোগ্য নয়। বিজেপি রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য এক সামাজিক মাধ্যমে লেখেন, “সরকারের ব্যর্থতার দায় মেয়েদের কাঁধে চাপানো যায় না।”
অন্য দিকে মুখ্যমন্ত্রী পাল্টা যুক্তি দিয়েছেন, “বেসরকারি কলেজগুলিরও দায়িত্ব আছে। তাঁদের ছাত্রছাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।” তিনি আরও বলেন, “রাতবেলায় বাইরে বেরোনোর আগে সচেতন হতে হবে। পুলিশ তো প্রত্যেকের পাশে থাকতে পারে না।”
এই ঘটনার তদন্তে উঠে এসেছে আরও ভয়াবহ চিত্র। দুর্গাপুর মেডিক্যাল কলেজের কাছেই ঝোপজঙ্গলে মদ-গাঁজার ঠেক বসে, যেখানে দীর্ঘদিন ধরেই অসামাজিক কার্যকলাপ চলছিল। বহুবার পুলিশ অভিযান চালালেও তা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। এই অবহেলাই এমন অপরাধের ক্ষেত্র তৈরি করেছে।
অন্য দিকে, ‘নির্যাতিতা’র বাবা তাঁর অভিযোগপত্রে প্রথম অভিযুক্ত হিসেবে মেয়ের সহপাঠীর নাম উল্লেখ করেছেন। তাঁর দাবি, সেই ছেলেটিই মেয়েকে মিথ্যা কথা বলে বাইরে নিয়ে যায় এবং তাঁর বন্ধুদের সহায়তায় এই ঘটনা ঘটায়। তিনি মেয়েকে ওড়িশায় স্থানান্তর করতে চান, কারণ এই ঘটনার পর তাঁর পরিবারের মধ্যে গভীর আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
এখন এই ঘটনার তদন্ত চলছে, তবে এর মাঝেই রাজনৈতিক চাপানউতোর শুরু হয়েছে। তৃণমূল সরকারকে কাঠগড়ায় তুলছে বিরোধীরা, আবার তৃণমূল প্রশ্ন তুলছে—বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে নারী নির্যাতনের ঘটনাগুলিতে কেন একইরকম কণ্ঠস্বর শোনা যায় না?
কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এই রাজনৈতিক দোষারোপের ভেতর দিয়ে আসল সমস্যা যেন আড়ালে না চলে যায়। দুর্গাপুরের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশে যদি নেশার আখড়া গড়ে ওঠে, যদি ছাত্রছাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হয়, তবে এই ধরনের অপরাধ আবারও ঘটবে। সমাজ, প্রশাসন এবং রাজনৈতিক দল—সবাইকে একযোগে এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে।
আর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, ভুক্তভোগী ও তাঁর পরিবারের পাশে থাকা। কারণ, এই মুহূর্তে তাঁদের সবচেয়ে বেশি দরকার আশ্বাস, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা। রাজনৈতিক কলহ বা বিভ্রান্তি যদি তদন্তকে থামিয়ে দেয়, তাহলে যেমন আর জি কর কাণ্ডের মতো ঘটনাগুলি মানুষের স্মৃতি থেকে মিলিয়ে যায়, তেমনি দুর্গাপুরের ঘটনাও ধীরে ধীরে হারিয়ে যাবে সময়ের গহ্বরে—আর সেটাই হবে সমাজের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা।
এই ঘটনার মধ্য দিয়ে একটাই বার্তা স্পষ্ট—নারীর নিরাপত্তা নিয়ে কোনও রাজনীতি নয়, চাই কঠোর আইন প্রয়োগ, সচেতনতা, এবং সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ববোধ। তবেই এমন লজ্জাজনক ঘটনা আর পুনরাবৃত্তি হবে না।


