এসআইআর পদ্ধতির বিরুদ্ধে আন্দোলনে ধর্মতলার মেট্রো চ্যানেলকে আবারও রাজনৈতিক লড়াইয়ের কেন্দ্র করে তুললেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। শুক্রবার শুরু হওয়া ধর্না কর্মসূচিতে যেন ফিরে এল দুই দশক আগের সিঙ্গুর আন্দোলনের স্মৃতি। মঞ্চে বক্তব্য, গান এবং স্মৃতিচারণার মধ্য দিয়ে বারবার উঠে এল সেই সময়ের কথা, যখন সিঙ্গুরের জমি আন্দোলনের সময় টানা ২৬ দিন অনশন করেছিলেন মমতা।
মমতা প্রায়ই বলেন, ‘আন্দোলনেই আমার জন্ম।’ দীর্ঘ চার দশকের রাজনৈতিক জীবনে নানা আন্দোলনের মাধ্যমে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন তিনি। সেই অভিজ্ঞতাকেই কাজে লাগিয়ে এসআইআর পদ্ধতির বিরুদ্ধে আন্দোলনে তিনি ব্যবহার করলেন তাঁর সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক অস্ত্র—ধর্মতলায় ধর্না।
শুক্রবার ধর্না শুরু হলেও তা একদিনে শেষ হচ্ছে না। মমতা নিজেই জানিয়েছেন, শনিবার সকাল ১০টা থেকে আবার কর্মসূচি শুরু হবে। আগের দু’বারের মতো এ বারও মেট্রো চ্যানেলের মঞ্চেই রাত কাটিয়েছেন তিনি। মঞ্চে পর্দা টাঙিয়ে সেখানেই অবস্থান করছেন তৃণমূল নেত্রী।
দুই দশক আগে সিঙ্গুর আন্দোলনের সময় এই একই জায়গায় বসে অনশন করেছিলেন মমতা। সেই ইতিহাসের কথাই শুক্রবার বারবার উঠে আসে ধর্না মঞ্চে। মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন কবি জয় গোস্বামী এবং গায়ক-সঙ্গীতকার কবীর সুমন। তাঁদের বক্তব্যেও ফিরে আসে সিঙ্গুর আন্দোলনের দিনগুলোর স্মৃতি। স্মরণ করা হয় প্রয়াত সাহিত্যিক মহাশ্বেতা দেবী এবং গণসংগীত শিল্পী প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের নামও, যাঁরা সেই সময় আন্দোলনের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।
জমায়েতেও ছিল সেই ইতিহাসের প্রতিফলন। সিঙ্গুর থেকে আসা ৫৫ বছরের দিগন্ত সাঁতরা জানান, “সে দিন জমির জন্য দিদির পাশে ছিলাম। আজ ভোটাধিকারের জন্য আছি। অনেকে দিদির হাত ছেড়েছে, আমি ছাড়িনি, ছাড়বও না।”
শুক্রবার দুপুরে ধর্না শুরু হওয়ার সময় মেট্রো চ্যানেলে উপচে পড়া ভিড় দেখা গেলেও বিকেল পাঁচটার পর ভিড় কিছুটা কমতে শুরু করে। তবে তরুণ এবং মহিলাদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।
ধর্মতলায় এর আগে দু’বার ধর্নায় বসেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দু’বারই তাঁর রাজনৈতিক লক্ষ্য অনেকটাই পূরণ হয়েছে। সিঙ্গুর আন্দোলনের আইনি এবং রাজনৈতিক জয় আজ ইতিহাসের অংশ। পরে ২০১৯ সালে তৎকালীন পুলিশ কমিশনার রাজীব কুমারের বাড়িতে কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থার হানার প্রতিবাদেও ধর্নায় বসেছিলেন তিনি। সেই ঘটনাতেও শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি অনেকটাই তাঁর পক্ষে যায়।
এ বার মুখ্যমন্ত্রী হয়েও মমতা নিজেকে আন্দোলনের নেত্রী হিসেবেই তুলে ধরতে চাইছেন। তাঁর আক্রমণের নিশানায় শুধু বিজেপি নয়, নির্বাচন কমিশনও। অনেকের মতে, ভোটার তালিকা সংশোধন, সংখ্যালঘু ভোটের সমীকরণ এবং নানা নির্বাচনী হিসাবকে ঘিরে তৃণমূলের উদ্বেগ বাড়তেই এই আন্দোলনের পথ বেছে নেওয়া হয়েছে।
তবে ধর্না মঞ্চ থেকে আত্মবিশ্বাসী সুরেই কথা বলেছেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর দাবি, “এক বছর আগে যা বলেছিলাম, আজও তা-ই বলছি। এ বার তৃণমূলের ভোট এবং আসন দুই-ই বাড়বে। বিজেপিকে ৫০-এর নীচে নামাতে হবে। যা দেখছি, তাতে ৪০-এর নীচে নেমে গেলেও অবাক হব না।”
শুক্রবারের ধর্না মঞ্চে বিভিন্ন স্তরের মানুষের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। কয়েক জন পার্শ্বশিক্ষক নিজেদের দাবি জানিয়ে প্ল্যাকার্ড তুললেও সামগ্রিকভাবে কর্মসূচি ছিল সংগঠনের নিয়ন্ত্রণেই। প্রথম দিনের ধর্নাতেই স্পষ্ট—ধর্মতলার এই আন্দোলন আগামী দিনে রাজ্য রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।


