শঙ্কু সাঁতরা: কোলকাতার সন্তোষ মিত্র স্কোয়ারের দুর্গাপুজো সবসময়ই আড়ম্বর ও বিতর্কে ভরা। এবছরও সেই ধারার ব্যতিক্রম হয়নি। পুজোর উদ্বোধন করেন স্বয়ং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, যা এক প্রকার রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেই ধরা হয়েছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই এই পুজোতে বিজেপির ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে সজল ঘোষের উপস্থিতি ও তাঁর রাজনৈতিক তৎপরতা এই পুজোকে আরও বেশি করে আলোচনার কেন্দ্রে এনেছে।
প্যান্ডেলে আড়াই মিনিটের একটি ভিডিও প্রদর্শন করা হয়, যেখানে ফুটে ওঠে গত ২২শে এপ্রিলের পহেলগাঁওয়ের নারকীয় সন্ত্রাসী হামলার দৃশ্য। এই হামলায় প্রাণ হারিয়েছিলেন ২৬ জন সাধারণ মানুষ। দেশজুড়ে সেই ঘটনা প্রবল ক্ষোভ সৃষ্টি করেছিল। সজলের পুজো প্যান্ডেলে সেই দৃশ্য প্রদর্শনের ফলে দর্শকদের ভিড় উপচে পড়ে। অনেকেই বলছেন, দুর্গা প্রতিমা দেখার থেকে বেশি মানুষ ভিড় করেছেন সেই ভিডিও দেখতে। ফলে একেবারে নতুন ধরণের আলোচনার জন্ম দিয়েছে এই পুজো।
তবে ভিড় সামলাতে গিয়ে পুলিশের সঙ্গে সংঘাত তৈরি হয়। সজল ঘোষ অভিযোগ তোলেন, পুলিশ নাকি ইচ্ছে করেই রাস্তা ব্যারিকেড দিয়ে আটকে দিচ্ছে যাতে মানুষ তাঁর পুজো ভালোভাবে দেখতে না পারে। বিষয়টি দ্রুত রাজনৈতিক রঙ নেয়। সজল এমনকি হুমকিও দেন, প্রয়োজনে তিনি পুজো বন্ধ করে দেবেন। এই টানাপোড়েনের জেরে সামাজিক মাধ্যমে তুমুল বিতর্ক শুরু হয়। রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দেন বহু মানুষ। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বাচনের আগে এই বিতর্ক বিজেপির পক্ষে ইতিবাচক ফল বয়ে আনতে পারে।
অন্যদিকে সজল ঘোষ এই ঘটনায় নিজের লড়াকু ইমেজ গড়ে তোলার সুযোগ পান। নিজেকে তিনি সাধারণ মানুষের পক্ষে দাঁড়ানো নেতা হিসেবে তুলে ধরতে সক্ষম হন। বামপন্থী প্রবীণ আইনজীবী ফিরদৌস শামিম পর্যন্ত তাঁর পাশে দাঁড়ানো ঘটনাটিকে অন্য মাত্রা দেয়। ফলে বিজেপির ভেতরেও সজলের গুরুত্ব বহুগুণে বেড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, সজল ঘোষ এবার তাঁর বাবা প্রদীপ ঘোষকেও অনেকটা পিছনে ফেলে দিয়েছেন।
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের প্রেক্ষিতে এই পুজো নিঃসন্দেহে বড় রাজনৈতিক অঙ্ক কষে দিয়েছে। সজল যদি বিজেপির টিকিট পান, তাহলে তাঁর জয় প্রায় নিশ্চিত বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ পুজোর মাধ্যমে তিনি একদিকে মানুষের আবেগকে ছুঁতে পেরেছেন, অন্যদিকে নিজেকে রাজ্যের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
সব মিলিয়ে, এবারের সন্তোষ মিত্র স্কোয়ারের দুর্গাপুজো শুধুই উৎসবের জাঁকজমক নয়, বরং একেবারে রাজনীতির মঞ্চে পরিণত হয়েছে। দুর্গা প্রতিমা দর্শনের চাইতে রাজনৈতিক বার্তাই এখানে বেশি প্রতিধ্বনিত হয়েছে। ফলে অনেকে মন্তব্য করছেন—“রাজনীতি ও ঠাকুর পুজোর মিশেলে এবারের পুজো সত্যিই অন্য মাত্রা পেয়েছে।”


