১০ই মে সকালে ইকো পার্ক-এ হাঁটতে বেরিয়ে দিলীপ ঘোষ হয়তো বুঝতেই পারেননি, তিনি মর্নিং ওয়াকে যাচ্ছেন নাকি রাজনৈতিক ‘রোড শো’-তে অংশ নিতে চলেছেন। কয়েক মাস আগেও যেখানে তাঁর সকালের সঙ্গী ছিল হাতে গোনা কয়েকজন অনুগামী ও কিছু নিয়মিত প্রাতঃভ্রমণকারী, সেখানে এদিন দেখা গেল কার্যত জনস্রোত। পরিস্থিতি এমন যে, উপস্থিত এক দর্শক মজা করে বলেন, “আজ যদি দিলীপবাবুর পঞ্চাশটা পা থাকত, তাহলেও এত লোকের সঙ্গে হাত মেলানো শেষ হত না!”
রাজনীতিতে সময়ের চেয়ে বড় মেকআপ আর কিছু নেই। যাঁরা কিছুদিন আগেও দিলীপ ঘোষকে রাজনৈতিকভাবে ‘আউটডেটেড মডেল’ ভেবে দূরে সরে গিয়েছিলেন, তাঁরাই এখন কাঁধ ছুঁয়ে ছবি তুলতে ও প্রণাম করতে ব্যস্ত। কারণ, সামনে পঞ্চায়েত ও পুরসভার নির্বাচন। আর বাংলার রাজনীতিতে টিকিটের গন্ধ যেখানে, সেখানে আদর্শ অনেক সময় সকালের কুয়াশার মতো মিলিয়ে যায়।
৪ঠা মে নির্বাচনে জয়ের পর থেকেই দিলীপ-ঘনিষ্ঠদের উৎসাহ ধীরে ধীরে অতি-উৎসাহে পরিণত হয়েছে। ৯ই মে মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর সেই উৎসাহ যেন সরাসরি ‘দিলীপ দর্শন উৎসব’-এ বদলে যায়। সকালের হাঁটার রাস্তায় এমন সব মুখ দেখা গেল, যাঁদের অনেকেই একসময় দিলীপ ঘোষকে এড়িয়ে চলতেন। এখন অবশ্য রাজনৈতিক সৌজন্যের নতুন সংজ্ঞা—“আগে সমালোচনা, পরে প্রণাম।”

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ছিল সংবাদমাধ্যমের উপস্থিতি। একসময় অভিযোগ ছিল, ইকো পার্কে দিলীপ ঘোষ সংবাদমাধ্যমের সামনে মুখ খুলবেন বলেই সাংবাদিকদের প্রবেশে কড়াকড়ি ছিল। ক্যামেরা নিয়ে ঢুকলেই নাকি বের করে দেওয়ার নির্দেশ থাকত। অথচ ১০ই মে সেই একই পার্কে সাংবাদিকরা দিব্যি ক্যামেরা কাঁধে ঘুরলেন। কেউ বাধা দিল না। রাজনীতির অভিধানে একেই বলে—ক্ষমতার হাওয়া বদলালে নিরাপত্তারক্ষীর ব্যবহারও বদলে যায়।
মন্ত্রীত্ব নিয়ে প্রশ্নে দিলীপ ঘোষ অবশ্য সতর্ক। তিনি জানান, কোন দপ্তর মিলবে তা সোমবার ঠিক হবে। উপমুখ্যমন্ত্রী হওয়ার জল্পনাও উড়িয়ে দিয়ে বলেন, “পার্টি যা দায়িত্ব দেবে, তাই করব।” তবে রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়ে তাঁর কড়া মন্তব্য স্পষ্ট করেছে—তিনি এখনও আগের মতোই আক্রমণাত্মক।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে উদ্দেশ্য করে তাঁর পরামর্শও কম তাৎপর্যপূর্ণ নয়—“শান্তিতে ঘরে বসে ঝালমুড়ি খেতে খেতে বিজেপি কী করছে দেখুন।” বাংলার রাজনীতিতে ঝালমুড়ি বহুদিন ধরেই সাংস্কৃতিক প্রতীক, তবে এদিন সেটাই হয়ে উঠল রাজনৈতিক ব্যঙ্গের অস্ত্র।
দিলীপ ঘোষ এদিন শান্ত ছিলেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর সকালের হাঁটা বুঝিয়ে দিল—বাংলার রাজনীতিতে এখন হাঁটার থেকেও দ্রুত বদলাচ্ছে সম্পর্কের গতি।


