ফুটবলপ্রেমী বাঙালির আবেগের সঙ্গে যদি কোনও বিদেশি খেলোয়াড়ের নাম সবচেয়ে বেশি জড়িয়ে থাকে, তাহলে তিনি নিঃসন্দেহে দিয়েগো মারাদোনা। আর্জেন্টিনার এই কিংবদন্তি ফুটবলার শুধু বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়কই ছিলেন না, বাংলার অসংখ্য মানুষের কাছে তিনি ছিলেন এক অনুভূতির নাম।
এক সময় বাংলার ফুটবলমহলে মজা করেই বলা হতো, “ভগবানের উচ্চতা ৫ ফুট ৫ ইঞ্চি।” কথাটি আসলে মারাদোনাকে ঘিরেই। মাঠে তাঁর জাদুকরী দক্ষতা, অসম্ভবকে সম্ভব করে তোলার ক্ষমতা এবং আর্জেন্টিনার হয়ে বিশ্বকাপ জয়ের কাহিনি তাঁকে বাঙালির ঘরের মানুষ করে তুলেছিল।
১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে তাঁর ‘হ্যান্ড অব গড’ গোল এবং সেই ম্যাচেই করা দুরন্ত একক গোল আজও ফুটবল ইতিহাসের অংশ। সেই বিশ্বকাপ থেকেই বাংলায় আর্জেন্টিনা সমর্থকদের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে শুরু করে, আর মারাদোনা হয়ে ওঠেন কোটি মানুষের নায়ক।
তবে শুধু ফুটবল নয়, তাঁর জীবনসংগ্রামও বাঙালির মন ছুঁয়েছিল। বুয়েনস আইরেসের এক দরিদ্র বস্তি থেকে উঠে এসে বিশ্বের সেরা ফুটবলারের আসনে পৌঁছনোর গল্প অনেকের কাছেই ছিল অনুপ্রেরণার উৎস।
২০০৮ সালে প্রথমবার কলকাতায় এসে মারাদোনা নিজেই বুঝতে পারেননি, তাঁকে ঘিরে কতটা উন্মাদনা তৈরি হয়েছে। বিমানবন্দর থেকে শহরের রাস্তায় হাজার হাজার মানুষ তাঁকে এক ঝলক দেখার জন্য অপেক্ষা করেছিলেন। আর্জেন্টিনার পতাকা, জার্সি আর ‘মারাদোনা’ ধ্বনিতে মুখর হয়ে উঠেছিল কলকাতা।
এরপর ২০১৭ সালে আবার কলকাতায় ফিরে এসে তিনি নিজের ১২ ফুট উঁচু মূর্তির উদ্বোধন করেন। অনুষ্ঠানে তিনি বলেছিলেন, “আমি ফুটবলের ঈশ্বর নই, আমি একজন সাধারণ ফুটবলার।” কিন্তু বাঙালি সমর্থকদের কাছে তিনি তখনও ছিলেন ‘ফুটবলের ভগবান’।
২০২০ সালে মারাদোনার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে শোকের ছায়া নেমে আসে। বহু ক্লাব, সংগঠন এবং ফুটবলপ্রেমী তাঁর স্মৃতিতে শ্রদ্ধা জানায়। আজও বিশ্বকাপ এলেই বাংলার অলিগলি, চায়ের আড্ডা এবং ফুটবলচর্চায় ফিরে আসে একটাই নাম—দিয়েগো মারাদোনা।
ফুটবলের সীমানা ছাড়িয়ে তিনি বাংলার সংস্কৃতি ও আবেগের অংশ হয়ে গিয়েছেন। তাই সময় বদলালেও বাঙালির হৃদয়ে মারাদোনার স্থান আজও অটুট।


