দীর্ঘদিন ভারতের মাটিতে থাকার পর বাংলাদেশে ফিরতে চাইছেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পালাবদলের পর থেকে তাঁর ভারত-বাসই হয়ে উঠেছিল ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কের অন্যতম বড় অস্বস্তির কারণ। এবার সেই হাসিনা যদি সত্যিই দেশে ফেরেন, তাহলে শুধু বাংলাদেশের রাজনীতিই নয়, ভারতের কূটনৈতিক কৌশলেও বড় পরিবর্তনের দরজা খুলতে পারে।
শেখ হাসিনার ভারত-বাসকে কেন্দ্র করে গত দু’বছর ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধারাবাহিকভাবে ভারত-বিরোধী বয়ান তৈরি হয়েছে। ঢাকার রাজনৈতিক মহলের একাংশের কাছে হাসিনা কার্যত একটি রাজনৈতিক ‘টার্গেট’। দেশের অর্থনৈতিক চাপ, মূল্যবৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার সমস্যা কিংবা রাজনৈতিক হিংসা—বিভিন্ন ব্যর্থতার দায়ও বারবার হাসিনা ও তাঁর ভারত-যোগের উপর চাপানো হয়েছে। কিন্তু হাসিনা যদি এবার নিজেই বাংলাদেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে সেই রাজনৈতিক অস্ত্রের ধার অনেকটাই ভোঁতা হয়ে যেতে পারে।
শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক সমীকরণের সামনে বড় প্রশ্ন তুলে দেবে। ২০২৪ সালের পর বিপর্যস্ত আওয়ামী লীগ এখনও সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়নি। দলের সাংগঠনিক শিকড়, ঐতিহাসিক ভোটব্যাঙ্ক এবং গ্রামীণ স্তরে রাজনৈতিক প্রভাবের একটা অংশ এখনও রয়েছে। হাসিনা দেশে ফিরে সেই শক্তিকে ফের সংগঠিত করতে পারলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ তৈরি হতে পারে। বিএনপি-নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন শিবিরের পাশাপাশি আওয়ামী লীগ ফের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে উঠে আসার সুযোগ পেতে পারে।
আর এখানেই ভারতের কৌশলগত সুবিধা। দীর্ঘদিন ধরে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগকে নয়াদিল্লি বাংলাদেশের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে দেখেছে। সীমান্ত নিরাপত্তা থেকে শুরু করে উত্তর-পূর্ব ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদ মোকাবিলা, রেল ও নদীপথে যোগাযোগ বৃদ্ধি—একাধিক ক্ষেত্রে হাসিনা সরকারের সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠ সমন্বয় ছিল। তাই তাঁর রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন সফল হলে ভারত ফের বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি শক্তিশালী এবং তুলনামূলকভাবে ভারতপন্থী রাজনৈতিক শক্তির উপস্থিতি দেখতে পারে।
কিন্তু হাসিনা যদি দেশে ফিরে রাজনৈতিকভাবে ব্যর্থ হন, পরিস্থিতি তাতেও ভারতের জন্য পুরোপুরি নেতিবাচক হবে না। বরং এতদিনের ‘হাসিনা ইস্যু’ থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ পাবে নয়াদিল্লি। ভারতকে বাংলাদেশের একটি বড় রাজনৈতিক অংশ হাসিনার আশ্রয়দাতা হিসেবে দেখিয়ে যে ভারত-বিরোধী প্রচার চালিয়েছে, তাঁর প্রত্যাবর্তনের পর সেই অভিযোগের রাজনৈতিক ভিত্তি অনেকটাই দুর্বল হতে পারে। তখন ভারত সরাসরি বাংলাদেশের সরকারের সঙ্গে বাণিজ্য, সীমান্ত, তিস্তা জলবণ্টন, বিদ্যুৎ, জ্বালানি এবং আঞ্চলিক যোগাযোগ নিয়ে আরও বাস্তববাদী আলোচনায় যেতে পারবে।
এই পরিস্থিতি আওয়ামী লীগের কাছেও একটি বড় পরীক্ষা হয়ে উঠবে। হাসিনা যদি রাজনৈতিকভাবে ফিরে আসতে পারেন, তাহলে দলটি ফের তাঁর নেতৃত্বে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করবে। আর যদি তাঁর রাজনৈতিক অধ্যায় কার্যত শেষ হয়ে যায়, তাহলে আওয়ামী লীগকে শেখ পরিবারের নেতৃত্বের বাইরে বেরিয়ে নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব তৈরি করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদে সেটিই হয়তো দলটির পুনর্গঠনের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এমন পরিস্থিতি বিরল, যেখানে একই ঘটনার দুই সম্ভাব্য ফলই একটি দেশের কৌশলগত সুবিধা তৈরি করতে পারে। শেখ হাসিনার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন ভারতের ক্ষেত্রে অনেকটা তেমনই। হাসিনা সফল হলে নয়াদিল্লি ফের পেতে পারে একটি শক্তিশালী ও ঐতিহাসিকভাবে ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক অংশীদার। আর হাসিনা ব্যর্থ হলে ভারত দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক দায় থেকে বেরিয়ে এসে বাংলাদেশের সঙ্গে নতুন বাস্তবতায় সম্পর্ক গড়ে তোলার আরও বেশি স্বাধীনতা পাবে।
তাই শেখ হাসিনার দেশে ফেরার উদ্যোগ শুধুমাত্র একজন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বাংলাদেশের ক্ষমতার সমীকরণ, আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ এবং দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের কৌশলগত অবস্থান। শেষ পর্যন্ত হাসিনা দেশে ফিরে রাজনীতির ময়দানে দাঁড়াতে পারবেন, নাকি আইনি ও রাজনৈতিক চাপে পড়বেন, তার উত্তর সময়ই দেবে। তবে তাঁর ভারত-পর্ব শেষ হলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের পুরনো সমীকরণও যে আর আগের জায়গায় থাকবে না, তা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে।


