ভারত ও কানাডার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও মজবুত করতে আগামী ১১ ও ১২ ডিসেম্বর কানাডা সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ভারতের হাইকমিশনের তরফে এই সফরের কথা জানানো হয়েছে। বাণিজ্য, জ্বালানি, প্রযুক্তি, নিরাপত্তা এবং দুই দেশের মানুষের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি সফরের আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে। দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক টানাপোড়েন কাটিয়ে সম্পর্কের ইতিবাচক অগ্রগতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই এই সফরের অন্যতম লক্ষ্য।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নিও মোদির সফরের দিনক্ষণ নিশ্চিত করেছেন। ক্যালগারির একটি রেস্তরাঁয় উপস্থিত ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি জানান, মোদির সঙ্গে তাঁর সম্প্রতি টেলিফোনে কথা হয়েছে। সফরে টরন্টো ও অটোয়া যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানান তিনি। সফরের পরিধি আরও বাড়ানো যায় কি না, তা নিয়েও ভাবনাচিন্তা চলছে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন কার্নি।
ভারতীয় হাইকমিশনের তরফে জানানো হয়েছে, সাম্প্রতিক কথোপকথনে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ইতিবাচক গতিকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাস্তবসম্মত অগ্রগতি অর্জনের বিষয়ে একমত হয়েছেন। মোদিও কার্নির সঙ্গে তাঁর কথোপকথনকে আন্তরিক ও ফলপ্রসূ বলে উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্য, ভারত ও কানাডা একটি আরও স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ বিশ্ব গড়ে তোলার লক্ষ্যে অবদান রাখছে।
কানাডার প্রধানমন্ত্রীর দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, দুই দেশের মধ্যে প্রস্তাবিত সার্বিক অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তির আলোচনা যত দ্রুত সম্ভব শেষ করার বিষয়ে দুই নেতা তাঁদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন। ২০৩০ সালের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ দ্বিগুণ করার লক্ষ্যও রয়েছে। পাশাপাশি ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা, জ্বালানি ও কৃষিক্ষেত্রে সহযোগিতা এবং দ্বিপাক্ষিক নিরাপত্তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
ভারত ও কানাডার মধ্যে বাণিজ্য আলোচনা বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে। রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে নিউ ইয়র্কে গিয়ে কার্নি জানিয়েছিলেন, ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হচ্ছে। ডিসেম্বরের মাঝামাঝি জি২০ শীর্ষ সম্মেলনের আগেই আলোচনা শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে বলে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন।
কানাডার সংবাদমাধ্যম ‘দ্য গ্লোব অ্যান্ড মেল’-এর একটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল, বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত হলে মোদির সফরে সেটি স্বাক্ষরিত হতে পারে। প্রতিবেদনে ভারতের রাষ্ট্রদূত দীনেশ পাটনায়েকের বক্তব্যের উল্লেখ করা হয়। চলতি বছরের মার্চ মাসে দুই দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে একটি পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা শুরু করেছিল। ২০২৬ সালের শেষের মধ্যে আলোচনা শেষ করার বিষয়ে দুই পক্ষই সম্মত হয়েছিল। এবারের জি২০ শীর্ষ সম্মেলন ১৪ ও ১৫ ডিসেম্বর মায়ামিতে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। ফলে সম্মেলনের আগে বাণিজ্য আলোচনায় চূড়ান্ত অগ্রগতি হলে তা দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে।
২০২৩ সালে কানাডার ব্রিটিশ কলম্বিয়ায় শিখ কর্মী হরদীপ সিং নিজ্জরের হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে ভারত ও কানাডার সম্পর্কের অবনতি ঘটে। তৎকালীন কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ভারতীয় সরকারি এজেন্টদের সম্ভাব্য যোগসূত্র থাকার অভিযোগ তুলেছিলেন। ভারত সেই অভিযোগকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করে। পরবর্তী সময়ে কানাডার রয়্যাল কানাডিয়ান মাউন্টেড পুলিশও সে দেশে একাধিক হিংসাত্মক ঘটনা ও হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ভারতীয় এজেন্টদের কথিত যোগসূত্রের বিষয়ে অভিযোগ তোলে।
তবে মার্ক কার্নি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই দুই দেশের সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। চলতি বছরের শুরুতে তাঁর ভারত সফর ছিল ২০১৮ সালের পর কোনও কানাডীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রথম দ্বিপাক্ষিক ভারত সফর। এবার ডিসেম্বরে মোদির কানাডা সফরের মাধ্যমে সেই ইতিবাচক উদ্যোগ আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা হবে। বাণিজ্য চুক্তি, নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং কৌশলগত অংশীদারিত্বের ভবিষ্যৎ এই সফরে বিশেষ গুরুত্ব পেতে চলেছে।


