নির্বাচন কমিশনের অন্দরের মতপার্থক্য নিয়ে বিতর্ক এবার পৌঁছে গেল সুপ্রিম কোর্টে। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে শীর্ষ আদালতে দায়ের হয়েছে জনস্বার্থ মামলা। মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে পদক্ষেপের পাশাপাশি, তাঁর নেতৃত্বে নেওয়া একাধিক সিদ্ধান্ত, নির্দেশিকা এবং ভোটার তালিকা সংক্রান্ত সফটওয়্যার পরিবর্তন বাতিল করার দাবিও জানানো হয়েছে।
আইনজীবী শৈলেন্দ্র মণি ত্রিপাঠীর দায়ের করা এই মামলায় দাবি করা হয়েছে, কমিশনের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সম্মতি ছাড়া নেওয়া সিদ্ধান্তগুলি আইনসঙ্গত বলে গণ্য করা উচিত নয়। বিশেষ করে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা SIR ঘিরে নেওয়া বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। জ্ঞানেশ কুমারের পাশাপাশি সিনিয়র ডেপুটি নির্বাচন কমিশনার মনীশ গার্গ এবং নির্বাচন কমিশনের ডিরেক্টর জেনারেল (আইটি) সীমা খান্নার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন করা হয়েছে।
মামলার পেছনে রয়েছে নির্বাচন কমিশনের অন্দরের সাম্প্রতিক টানাপোড়েন নিয়ে প্রকাশিত রিপোর্ট। ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর তদন্তমূলক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল, গত ১০ মাসে নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক যোশী অন্তত ১৪ বার বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে লিখিত আপত্তি জানিয়েছিলেন। অভিযোগের বিষয়গুলির মধ্যে ছিল নতুন ভোটার অন্তর্ভুক্তি, ভোটার বাদ দেওয়া এবং ভোটার তালিকার তথ্যভাণ্ডার ও সফটওয়্যারের নিয়ন্ত্রণ।
SIR ঘিরে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে ভোটার তালিকায় নাম তোলা এবং বাদ দেওয়ার পদ্ধতি নিয়ে। ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, নতুন ভোটারদের জন্য Form 6-এ এমন কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছিল, যা নিয়ে দুই নির্বাচন কমিশনার আগেই আপত্তি জানিয়েছিলেন। তাঁদের বক্তব্য ছিল, সংশ্লিষ্ট নিয়ম পরিবর্তন না করে এই ধরনের সংশোধন করা যায় না।
ভোটার তালিকার সফটওয়্যার নিয়েও কমিশনের ভিতরে আপত্তির কথা সামনে এসেছে। দুই নির্বাচন কমিশনার অভিযোগ করেছিলেন, ভোটার ডেটাবেসের নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে কেন্দ্রীয়করণের দিকে যাচ্ছে এবং এর ফলে মাঠপর্যায়ের Electoral Registration Officer-দের ভূমিকা সীমিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে তাঁরা কেন্দ্রীয় সরকারের ক্যাবিনেট সচিবের কাছেও উদ্বেগ জানিয়েছিলেন বলে রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে।
তবে নির্বাচন কমিশন এই অভিযোগের ব্যাখ্যায় জানিয়েছে, কমিশনের ভিতরে বিভিন্ন মত ও পর্যবেক্ষণ থাকা স্বাভাবিক। তাদের দাবি, গত এক বছরে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলি পূর্ণ কমিশনের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হিসেবেই হয়েছে। অর্থাৎ দুই কমিশনারের নোট বা আপত্তিকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের সঙ্গে এক করে দেখা ঠিক নয়—এমনটাই কমিশনের বক্তব্য।
এদিকে নতুন করে দায়ের হওয়া মামলায় শুধু সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবিই নয়, SIR চলাকালীন ভোটার তালিকা থেকে বিপুল সংখ্যক নাম বাদ যাওয়ার বিষয়েও তদন্তের আবেদন করা হয়েছে। মামলাকারী এই বিষয়ে বিচারবিভাগীয় তদন্ত কমিশন অথবা বিশেষ তদন্তকারী দল বা SIT গঠনের আবেদন জানিয়েছেন। পাশাপাশি ভোটার হিসেবে নাম নথিভুক্তির ক্ষেত্রে প্রচলিত Form 6 পুনর্বহালের দাবিও রাখা হয়েছে।
সব মিলিয়ে নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি, ভোটার তালিকা সংশোধন এবং SIR-এর কার্যপ্রণালী নিয়ে নতুন করে আইনি লড়াই শুরু হল সুপ্রিম কোর্টে। এখন শীর্ষ আদালত এই আবেদনের বিষয়ে কী অবস্থান নেয়, সেদিকেই নজর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলের।


