ভারত ও সুইজারল্যান্ডের সম্পর্ক আরও মজবুত করার পথে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হল। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং সুইজারল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট গাই পারমেলিনের বৈঠকের পর দুই দেশের মধ্যে পাঁচটি চুক্তি ও সমঝোতা স্বাক্ষরিত হয়েছে। বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পাশাপাশি প্রতিরক্ষা, পরমাণু শক্তি, পরিবহণ, গবেষণা এবং প্রযুক্তি ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছে দুই দেশ।
পারমেলিনের ভারত সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। ইউরোপীয় মুক্ত বাণিজ্য সংস্থা EFTA-র সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য চুক্তি কার্যকর হওয়ার এক বছর পূর্তির সময়েই এই সফর। EFTA-র সদস্য সুইজারল্যান্ড, নরওয়ে, আইসল্যান্ড এবং লিচেনস্টাইনের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও বিস্তারের লক্ষ্য রয়েছে।
বৈঠকের পর মোদি জানান, সুইস বাজারে ভারতীয় পণ্যের প্রবেশ আরও সহজ করার জন্য নতুন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কৃষি, ওষুধ, বস্ত্র এবং ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্যের রফতানি বাড়ানোর পাশাপাশি সুইজারল্যান্ড থেকে ভারতে নতুন বিনিয়োগ টানার উদ্যোগও নেওয়া হবে। বায়োটেকনোলজি, স্বাস্থ্য, ব্যাঙ্কিং, বিমা, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
দুই দেশের মধ্যে অভিবাসন ও পেশাদারদের চলাচল নিয়েও নতুন সমঝোতা হয়েছে। এর ফলে নিয়ম মেনে যাতায়াত ও কাজের সুযোগ বাড়বে এবং একই সঙ্গে অবৈধ অভিবাসন ও মানবপাচার প্রতিরোধে সহযোগিতা জোরদার হবে। নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে পাঁচ বছর পর্যন্ত একাধিকবার প্রবেশের ভিসার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
তরুণ পেশাদারদের জন্যও তৈরি হচ্ছে নতুন সুযোগ। দুই দেশের যুব পেশাজীবীরা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অন্য দেশে গিয়ে কাজের অভিজ্ঞতা ও ভাষাগত দক্ষতা অর্জন করতে পারবেন। শুরুতে প্রতি দেশ থেকে বছরে ৩০০ জন এই সুযোগ পাবেন। ভবিষ্যতে সেই সংখ্যা ৫০০ পর্যন্ত বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
বৈঠকে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিষয়টিও বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। সামরিক পর্যায়ে পারস্পরিক যোগাযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনে যৌথভাবে কাজ করার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। পরমাণু শক্তির ক্ষেত্রেও দুই দেশের সহযোগিতা আরও বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
পরিবহণ ও পরিকাঠামো ক্ষেত্রেও নতুন দরজা খুলছে। টেকসই পরিকাঠামো, বৈদ্যুতিক যান, রোপওয়ে এবং টানেল নির্মাণের মতো ক্ষেত্রে সুইস প্রযুক্তি ও ভারতের পরিকাঠামোগত সক্ষমতাকে একসঙ্গে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
গবেষণা ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রেও একাধিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য, পরিচ্ছন্ন শক্তি এবং মহাকাশ গবেষণার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে যৌথ প্রকল্প শুরু করার কথা জানিয়েছেন মোদি। উদ্ভাবন, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং নতুন উদ্যোগ গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও দুই দেশ সহযোগিতা বাড়াবে।
তবে অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর করতে কিছু বিষয়ে দ্রুত অগ্রগতি প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন পারমেলিন। বিশেষ করে বিনিয়োগ সুরক্ষা চুক্তি এবং মেধাস্বত্ব সংক্রান্ত আলোচনাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন তিনি।
আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও বাদ যায়নি দুই নেতার আলোচনায়। ইউক্রেন এবং পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত নিয়ে দুই দেশই সংলাপ ও কূটনীতির মাধ্যমে শান্তির পথ খোঁজার প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছে।
বর্তমানে EFTA-র মধ্যে ভারতের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার সুইজারল্যান্ড। দুই দেশের মধ্যে বার্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার। ভারতে প্রায় ৩৪০টি সুইস সংস্থা ব্যবসা করছে এবং তাদের মোট বিনিয়োগ প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে সুইজারল্যান্ডে প্রায় ৩০ হাজার ভারতীয় পড়াশোনা, তথ্যপ্রযুক্তি, আর্থিক পরিষেবা, ইঞ্জিনিয়ারিং ও ওষুধ শিল্পের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন।


