আজ মহালয়া। ভোরের আলো ফোটার আগেই শিউলি ফুলের গন্ধ, শিশিরভেজা প্রকৃতি আর রেডিয়ো থেকে ভেসে আসা চণ্ডীপাঠ—সব মিলিয়ে বাঙালির মনে বেজে উঠেছে দুর্গাপুজোর আগমনী সুর। পুজোর আর মাত্র কয়েকটা দিনের অপেক্ষা। মহালয়ার হাত ধরেই বাঙালির মনে শুরু হয়ে যায় দেবী দুর্গাকে বরণ করে নেওয়ার প্রস্তুতি। চারদিকে যেন একটাই অনুভূতি, মা আসছেন!
মহালয়া মানেই বাঙালির আবেগ, ঐতিহ্য আর শৈশবের অসংখ্য স্মৃতি। ভোরবেলা ঘুম ভেঙে রেডিয়োয় বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ শোনার অভ্যাস আজও বহু বাঙালির জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সময় বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে, রেডিয়োর জায়গা নিয়েছে মোবাইল ফোন ও ডিজিটাল মাধ্যম। তবুও মহালয়ার ভোরে সেই চেনা কণ্ঠস্বর শুনতে আজও মন কেমন করে ওঠে। ছোটবেলার স্মৃতি আর পুজোর নস্টালজিয়া যেন এক মুহূর্তে ফিরে আসে।
ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, মহালয়ার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে পিতৃপক্ষের অবসান এবং দেবীপক্ষের সূচনার বিশেষ তাৎপর্য। এই দিনে বহু মানুষ তাঁদের প্রয়াত পূর্বপুরুষদের উদ্দেশে তর্পণ করেন। ভোর থেকেই গঙ্গার বিভিন্ন ঘাটে দেখা যায় মানুষের ভিড়। পূর্বপুরুষদের স্মরণ করে তাঁদের আত্মার শান্তি কামনা করেন অনেকে। দীর্ঘদিনের এই ঐতিহ্য আজও বাঙালির ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জীবনে বিশেষ জায়গা ধরে রেখেছে।
মহালয়ার অন্যতম আকর্ষণ চণ্ডীপাঠ এবং দেবী দুর্গার অসুরদলনীরূপের বর্ণনা। মহিষাসুরের বিরুদ্ধে দেবীর যুদ্ধের কাহিনি শুধু ধর্মীয় আখ্যান নয়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায় এবং অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ শক্তির জয়ের প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হয়। দেবীর আগমনের এই বার্তা যেন মানুষের মনে নতুন আশা ও শক্তির সঞ্চার করে।
এদিকে দুর্গাপুজোকে ঘিরে রাজ্যজুড়ে বাড়ছে উৎসবের উত্তাপ। কলকাতা থেকে জেলা, সর্বত্রই চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। কোথাও প্রতিমা তৈরির কাজ প্রায় শেষ, কোথাও মণ্ডপসজ্জায় ব্যস্ত শিল্পীরা, আবার কোথাও চলছে আলোকসজ্জার প্রস্তুতি। পুজোর কেনাকাটা, নতুন পোশাক আর প্রিয়জনদের সঙ্গে উৎসব কাটানোর পরিকল্পনায় মেতে উঠছেন সাধারণ মানুষও। মহালয়ার পর থেকেই যেন দুর্গাপুজোর অপেক্ষাটা আরও বেশি করে অনুভব করতে শুরু করেন বাঙালিরা।
তবে মহালয়া কেবল পুজোর আগমনী বার্তা নয়, এটি বাঙালির অনুভূতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা একটি দিন। ছোটবেলায় পরিবারের সঙ্গে ভোরে উঠে মহালয়া শোনা, মায়ের সঙ্গে পুজোর প্রস্তুতি, নতুন জামাকাপড়ের গন্ধ কিংবা পুজোর ছুটির অপেক্ষা—এই দিন ঘিরে থাকে অসংখ্য স্মৃতি। ব্যস্ত জীবনের মাঝেও মহালয়ার ভোর মানুষকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় সেই ফেলে আসা দিনগুলিতে।
আজ মহালয়া। ঢাকের আওয়াজ এখনও সব জায়গায় জোরে শোনা না গেলেও বাঙালির মনে শুরু হয়ে গিয়েছে পুজোর দিন গোনার পালা। আকাশে শরতের মেঘ, বাতাসে শিউলির সুবাস আর চণ্ডীপাঠের সুরে চারদিকে একটাই বার্তা—অপেক্ষার অবসান হতে চলেছে, মা দুর্গা আসছেন। বাঙালির হৃদয়ে তাই আজ থেকেই শুরু শারদোৎসবের আবেগঘন কাউন্টডাউন।


