সেপ্টেম্বরে দিল্লিতে মোদী-শি বৈঠক? BRICS ঘিরে ভারত-চিন সম্পর্কের নতুন সমীকরণ

Spread the love

নয়াদিল্লিতে সেপ্টেম্বর মাসে আয়োজিত হতে চলা BRICS সম্মেলনে চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের যোগদানের সম্ভাবনা ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে তৈরি হয়েছে জোর আলোচনা। বেজিংয়ের তরফে এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে শি জিনপিংয়ের ভারত সফর নিশ্চিত করা হয়নি। তবে একাধিক প্রতিবেদনে দাবি করা হচ্ছে, তাঁর সম্ভাব্য সফরকে কেন্দ্র করে প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। সফর বাস্তবায়িত হলে প্রায় সাত বছর পর ভারতে পা রাখবেন চিনা প্রেসিডেন্ট।

শি জিনপিং দিল্লিতে এলে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে তাঁর বৈঠকও হতে পারে। ২০২০ সালের গালওয়ান সংঘর্ষের পর দীর্ঘ সময় দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে রাজনৈতিক যোগাযোগ কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছিল। পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতির ধীরে ধীরে পরিবর্তন শুরু হয়। ২০২৪ সালের অক্টোবরে কাজান BRICS সম্মেলনের ফাঁকে মোদী ও শি-র বৈঠক ছিল সেই বরফ গলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।

এরপর ২০২৫ সালের অগস্টে সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের সম্মেলনে যোগ দিতে চিনের তিয়ানজিনে গিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। প্রায় সাত বছর পর তাঁর চিন সফরও বিশেষ তাৎপর্য বহন করেছিল। দুই দেশের মধ্যে সীমান্ত উত্তেজনা কমানোর পাশাপাশি বৃহত্তর রাজনৈতিক যোগাযোগ পুনরায় চালুর বার্তাও উঠে এসেছিল সেই সফরে।

সেপ্টেম্বরে শি জিনপিং দিল্লিতে এলে গত দু’বছরের মধ্যে মোদী-শি তৃতীয়বারের মতো মুখোমুখি বৈঠকে বসতে পারেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন ধারাবাহিক যোগাযোগ ইঙ্গিত করবে যে ভারত ও চিন উভয়েই দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের পরিবর্তে মতপার্থক্য নিয়ন্ত্রণ করে সম্পর্ককে স্থিতিশীল রাখার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করছে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে দুই দেশের সমস্ত সমস্যা মিটে গিয়েছে। প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বা LAC নিয়ে বিরোধ এখনও রয়েছে। এশিয়ায় কৌশলগত প্রতিযোগিতাও অব্যাহত। কিন্তু নিয়মিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠক দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পরিসর তৈরি করতে পারে।

সম্ভাব্য মোদী-শি বৈঠকের গুরুত্ব শুধু ভারত-চিন সম্পর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। BRICS সম্মেলনের মঞ্চে এমন বৈঠক হলে তার আন্তর্জাতিক কূটনীতিতেও বিশেষ প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যনীতি, শুল্কনীতি এবং বিশ্ব রাজনীতিতে পরিবর্তিত কৌশলের মধ্যে ভারত ক্রমশ নিজের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের ওপর জোর দিচ্ছে।

ভারতের অবস্থান অবশ্যই আমেরিকা থেকে দূরে সরে যাওয়া নয়। বরং ওয়াশিংটন, মস্কো, বেজিং এবং অন্যান্য শক্তিকেন্দ্রের সঙ্গে একইসঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে নিজের কূটনৈতিক বিকল্প খোলা রাখাই নয়াদিল্লির অন্যতম লক্ষ্য। সেই জায়গা থেকে দিল্লিতে মোদী-শি বৈঠক ভারতের বহুমুখী বিদেশনীতি এবং ‘স্ট্র্যাটেজিক অটোনমি’-র আরেকটি প্রকাশ হিসেবে দেখা হতে পারে।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও ভারত-চিন সম্পর্কের পরিবর্তিত পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ। ২০২০ সালের সীমান্ত সংঘর্ষের পর চিনা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে একাধিক বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল ভারত। তবে বর্তমানে ভারতের উৎপাদন বৃদ্ধি, সরবরাহ শৃঙ্খল শক্তিশালী করা এবং শিল্প পরিকাঠামো সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তার কারণে চিনা পুঁজি, প্রযুক্তি ও যন্ত্রাংশ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

চিনা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ছাড় নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রেখে কোন ক্ষেত্রে বিনিয়োগ গ্রহণযোগ্য হতে পারে—সেই প্রশ্নকে কেন্দ্র করেই নীতিগত আলোচনা এগোচ্ছে। এর পাশাপাশি চিনের উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর বিশ্ব অর্থনীতির নির্ভরতা এবং গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল ও শিল্প সরঞ্জামের সরবরাহ নিয়েও ভারতের উদ্বেগ রয়েছে।

বিশেষ করে বিরল খনিজ, গুরুত্বপূর্ণ শিল্প উপাদান এবং বিশেষায়িত যন্ত্রপাতির ক্ষেত্রে চিনের ভূমিকা আন্তর্জাতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিছু ক্ষেত্রে সরবরাহে বিলম্ব ভারতের শিল্প ও পরিকাঠামো প্রকল্পগুলিকেও প্রভাবিত করেছে। ফলে রাজনৈতিক উত্তেজনা থাকলেও অর্থনৈতিক যোগাযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করা বাস্তবে কঠিন—এমন উপলব্ধি দুই দেশের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে ক্রমশ জোরালো হচ্ছে।

ভারত-চিন সম্পর্কের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অবশ্যই সীমান্ত পরিস্থিতি। LAC-এ উত্তেজনা কমানো না গেলে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের উন্নতিও কঠিন। গত দু’বছরে সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে যে বোঝাপড়া তৈরি হয়েছে, তা মূল বিরোধের সমাধান না করলেও তাৎক্ষণিক উত্তেজনা কমাতে সাহায্য করেছে।

এর পাশাপাশি দুই দেশের কূটনৈতিক যোগাযোগও বেড়েছে। শীর্ষ আধিকারিকদের বৈঠক, বিদেশ মন্ত্রকের পর্যায়ের আলোচনা এবং জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত যোগাযোগের মাধ্যমে সম্পর্ককে ধীরে ধীরে একটি নতুন কাঠামোর দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চলছে।

এই পরিস্থিতিতে শি জিনপিংয়ের সম্ভাব্য দিল্লি সফর হবে সেই পরিবর্তনের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রতীকগুলির একটি। তাঁর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী মোদীর বৈঠক হলে তা শুধু একটি দ্বিপাক্ষিক বৈঠক হিসেবে দেখা হবে না; বরং দীর্ঘ কয়েক বছরের উত্তেজনার পর ভারত-চিন সম্পর্ক কোন পথে এগোচ্ছে, তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে বিবেচিত হবে।

দুই দেশের মধ্যে এখনও অবিশ্বাস রয়েছে, সীমান্ত বিরোধ রয়েছে এবং এশিয়ায় কৌশলগত প্রতিযোগিতাও অব্যাহত। কিন্তু সম্পর্কের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ধীরে ধীরে সামরিক সংঘাত থেকে সরে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, সরবরাহ শৃঙ্খল, কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং বহুপাক্ষিক সহযোগিতার দিকে এগোচ্ছে।

সেপ্টেম্বরে শি জিনপিং সত্যিই দিল্লিতে এলে সেই পরিবর্তন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে। BRICS-এর মঞ্চে মোদী-শি বৈঠক তখন ভারত-চিন সম্পর্কের পুনর্গঠনের পাশাপাশি ভারতের বহুমুখী ও ভারসাম্যপূর্ণ বিদেশনীতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হয়ে উঠতে পারে।


Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *