ক্ষমতায় আসার প্রথম ১০০ দিন পূর্ণ করলেন তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী সি. জোসেফ বিজয় এবং পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। একই সময়সীমার মধ্যে দুই নতুন সরকারের কর্মকাণ্ডে স্পষ্ট দুই ভিন্ন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক রণকৌশল। তামিলনাড়ুতে বিজয় সরকার জনকল্যাণ, শিক্ষা, কৃষক ও যুব সমাজকে অগ্রাধিকার দিয়েছে, অন্যদিকে বাংলায় শুভেন্দু অধিকারীর সরকার কল্যাণ প্রকল্পের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় প্রকল্পের বাস্তবায়ন, শিল্পে বিনিয়োগ, প্রশাসনিক পরিবর্তন এবং তোলাবাজি-সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে পদক্ষেপকে সামনে এনেছে।
১০০ দিন পূর্তি উপলক্ষে বিজয় সরকারের বার্তা ছিল ‘100 Days of Governance – A Government for Generations’। মহিলাদের নিরাপত্তার জন্য বিশেষ টাস্ক ফোর্স গঠন, সরকারি হাসপাতালে জন্ম নেওয়া শিশুদের সোনার আংটি দেওয়ার প্রকল্প এবং বিবাহযোগ্য মহিলাদের জন্য সোনার কয়েন ও রেশম শাড়ির মতো একাধিক জনমুখী প্রকল্প ঘোষণা করেছে সরকার। শিক্ষা ক্ষেত্রেও বড়সড় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দক্ষতা উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ছাত্রছাত্রী ও যুবকদের প্রশিক্ষণ, স্কুলের ব্রেকফাস্ট স্কিম সম্প্রসারণ এবং কলেজ পড়ুয়াদের ল্যাপটপ দেওয়ার জন্য বিপুল অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে।
কৃষকদের জন্যও বড় ঘোষণা করেছে বিজয় সরকার। ৬ হাজার কোটি টাকার ফসল ঋণ মকুবের পাশাপাশি আখ ও ধান চাষিদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা ঘোষণা করা হয়েছে। আবাসন, গ্রামীণ উন্নয়ন, কর্মসংস্থান এবং মহিলাদের স্বনির্ভরতার জন্যও একাধিক প্রকল্প চালু করা হয়েছে। শিল্প ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও প্রথম ১০০ দিনে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি পাওয়ার দাবি করেছে তামিলনাড়ু সরকার। একই সঙ্গে মাদক ও অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে বিশেষ টাস্ক ফোর্স গঠন এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় স্থানের কাছাকাছি থাকা একাধিক মদের দোকান বন্ধ করার কথাও জানিয়েছে প্রশাসন।
অন্যদিকে, পশ্চিমবঙ্গে শুভেন্দু অধিকারীর সরকারের প্রথম ১০০ দিনে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিবর্তন। রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় আগের সরকারের পরিচিত নীল-সাদা রঙের পরিবর্তে গেরুয়া রঙের ব্যবহার শুরু হয়েছে। স্কুল ও মাদ্রাসার প্রার্থনাসভায় ‘বন্দে মাতরম’ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে এবং ‘খেলা হবে দিবস’-এর পরিবর্তে ‘আয়ুষ্মান দিবস’ পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যদিও ক্ষমতায় আসার পর প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকেই শুভেন্দু অধিকারী আশ্বাস দিয়েছিলেন যে, চলতি কোনও জনকল্যাণ প্রকল্প বন্ধ করা হবে না।
লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের পরিবর্তে চালু হওয়া অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার প্রকল্পকে প্রথম ১০০ দিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরেছে নতুন সরকার। এই প্রকল্পে মহিলাদের মাসিক ভাতা বাড়িয়ে ৩ হাজার টাকা করার ঘোষণা করা হয়েছে। তবে উপভোক্তা যাচাই এবং নথিপত্র সংক্রান্ত সমস্যার কারণে কিছু মহিলার টাকা পাওয়া নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সরকার জানিয়েছে, সমস্ত নথি সঠিক থাকলে যোগ্য উপভোক্তাদের টাকা দেওয়া হবে।
কেন্দ্রীয় প্রকল্পগুলির দ্রুত বাস্তবায়নেও জোর দিয়েছে শুভেন্দু সরকার। পিএম কিসান, পিএম আবাস যোজনা, আয়ুষ্মান ভারত, জল জীবন মিশন এবং সূর্য ঘর প্রকল্পকে রাজ্যের উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, বাংলায় ‘ডাবল ইঞ্জিন’ সরকারের সুফল মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়াই এখন অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
তোলাবাজি, বেআইনি টোল এবং সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অভিযানও শুভেন্দু সরকারের প্রথম ১০০ দিনের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা। অভিযোগ জানানোর জন্য একাধিক টোল-ফ্রি হেল্পলাইন চালু হয়েছে। অভিযোগের ভিত্তিতে দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে বিজেপির দাবি। প্রশাসনিক স্তরেও দুর্নীতি ও বেআইনি কার্যকলাপের উপর নজরদারি বাড়াতে একাধিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
কর্মসংস্থান ও শিল্পে বিনিয়োগ টানাকেও অগ্রাধিকার দিয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী। পুরুলিয়ায় বড় ইস্পাত প্রকল্প, বাঁকুড়ায় শিল্প সম্প্রসারণ এবং বিভিন্ন শিল্পগোষ্ঠীর বিনিয়োগের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেছে রাজ্য সরকার। দীর্ঘদিন ধরে সমস্যায় থাকা চা ও বস্ত্র শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। বড় বিনিয়োগের জন্য সিঙ্গল উইন্ডো ক্লিয়ারেন্স ব্যবস্থা চূড়ান্ত করার কাজও চলছে।
বাংলাদেশ সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার করতে বিএসএফকে সীমান্ত বেড়া নির্মাণের জন্য জমি হস্তান্তরের সিদ্ধান্তকেও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে সরকার। বিশেষ করে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত এলাকার নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এই সিদ্ধান্তকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
প্রথম ১০০ দিনের হিসাব বলছে, দুই মুখ্যমন্ত্রীর শাসন মডেল ও রাজনৈতিক অগ্রাধিকার সম্পূর্ণ আলাদা। বিজয়ের তামিলনাড়ু সরকার জনকল্যাণ, শিক্ষা, কৃষক ও যুব উন্নয়নকে সামনে রেখে এগোতে চাইছে। অন্যদিকে শুভেন্দু অধিকারীর পশ্চিমবঙ্গ সরকার কল্যাণ প্রকল্পের সঙ্গে কেন্দ্রীয় প্রকল্প, প্রশাসনিক পরিবর্তন, শিল্প-বিনিয়োগ, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং তোলাবাজি-সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপকে গুরুত্ব দিয়েছে। আগামী দিনে এই প্রতিশ্রুতি ও ঘোষণাগুলি বাস্তবের মাটিতে কতটা কার্যকর হয়, সেটাই এখন দেখার।


